ধাপ ১: বৈশ্বিক তেলের ‘লাইফলাইন’ এবং হরমুজ প্রণালীর সংকট

আমাদের দেশের পাম্পগুলোতে কেন তেল নেই, তা বুঝতে হলে সবার আগে তাকাতে হবে মানচিত্রের দিকে। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের (ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন) প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করে, যার সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো (যেমন: সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও ইউএই) থেকে। এই দেশগুলো থেকে তেলের বিশাল জাহাজ বা ‘অয়েল ট্যাঙ্কার’ গুলোকে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছাতে হলে একটি অত্যন্ত সরু জলপথ পাড়ি দিতে হয়, যার নাম হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz)

বর্তমানে ইরান এবং এই অঞ্চলে চলমান যুদ্ধাবস্থার কারণে এই প্রণালীটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন এটি আমাদের পাম্পের সংকটের মূল কারণ, তার বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:

সরবরাহ ব্যবস্থা থমকে যাওয়া: প্রতিদিন বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ তেল এই ছোট পথটি দিয়ে পার হয়। ইরান যদি এই প্রণালী অবরোধ করে বা সেখানে যুদ্ধ চলে, তবে তেলের জাহাজগুলো চলাচলের সাহস পায় না। ফলে যে জাহাজটি আজ চট্টগ্রামে পৌঁছানোর কথা ছিল, সেটি হয়তো মাঝপথে আটকে আছে অথবা দীর্ঘ পথ ঘুরে আসার চেষ্টা করছে। এই ‘সাপ্লাই চেইন’ বা সরবরাহ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়ায় বাংলাদেশ সময়মতো প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছে না।

জাহাজের বীমা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি: যুদ্ধের সময় কোনো জাহাজ যদি ওই এলাকা দিয়ে যেতে চায়, তবে বীমা কোম্পানিগুলো কয়েক গুণ বেশি টাকা দাবি করে (War Risk Premium)। অনেক সময় জাহাজ মালিকরা তাদের কোটি কোটি টাকার জাহাজ ঝুঁকিতে ফেলতে চান না। ফলে বাংলাদেশ তেল আমদানির জন্য জাহাজ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। জাহাজ না থাকলে তেল আসবে কীভাবে?

আমদানিতে দীর্ঘসূত্রতা: সাধারণত আমাদের দেশে ১৫ থেকে ২০ দিনের জ্বালানি মজুত থাকে। কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতার কারণে নতুন জাহাজ আসতে যদি ১০ দিন দেরি হয়, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যায়। যখন পাম্পগুলো তেল পায় না, তখন তারা ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়।

সহজ কথায়, আমাদের তেলের উৎসের মুখ যেখানে, সেই হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধের আগুনের কারণে পাইপলাইনে তেলের প্রবাহ কমে গেছে। এটিই হলো সংকটের প্রথম এবং প্রধান আন্তর্জাতিক কারণ।

ধাপ ২: ডলার সংকট এবং এলসি (LC) জটিলতার অদৃশ্য দেয়াল

প্রথম ধাপে আমরা জানলাম আন্তর্জাতিক জলপথে যুদ্ধের কারণে তেল আসতে দেরি হচ্ছে। কিন্তু সেই তেল কেনার প্রক্রিয়াটি যখন দেশের ভেতরে শুরু হয়, তখন আমরা দ্বিতীয় বড় বাধার মুখে পড়ি—আর সেটি হলো ডলার সংকট। এই ধাপটি বুঝতে আপনাকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি গভীর প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হবে।

কেন ডলারের অভাবে পাম্পগুলো খালি থাকছে, তার বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:

তেল কেনার মুদ্রা (Petrodollar): আন্তর্জাতিক বাজারে তেল কিনতে হলে টাকা দিয়ে চলে না, সেখানে সরাসরি মার্কিন ডলার প্রয়োজন। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) যখন বিদেশ থেকে তেল আমদানির চুক্তি করে, তখন তাদের কয়েক কোটি ডলার একসাথে পেমেন্ট করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের টান পড়েছে। যখন আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ডলার কম থাকে, তখন সরকার বা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিদেশি তেল সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোকে সময়মতো পেমেন্ট করতে পারে না।

লেটার অফ ক্রেডিট বা এলসি (LC) খুলতে বিলম্ব: কোনো পণ্য বিদেশ থেকে আনতে হলে ব্যাংক থেকে একটি গ্যারান্টি পেপার বা এলসি খুলতে হয়। বর্তমানে ব্যাংকগুলো ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি তেলের মতো বড় আমদানির এলসি খুলতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় নিচ্ছে। আগে যেখানে ৩-৪ দিনে এলসি খোলা যেত, এখন সেখানে কয়েক সপ্তাহ লেগে যাচ্ছে। এই বিলম্বের কারণে বিদেশের বন্দরে তেল বোঝাই জাহাজগুলো দাঁড়িয়ে থাকলেও তারা বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে না যতক্ষণ না পেমেন্টের গ্যারান্টি পায়।

ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি: গত এক-দেড় বছরে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম অনেক বেড়েছে। আগে ১ ডলারে যে পরিমাণ তেল পাওয়া যেত, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত টাকা জোগাড় করা এবং তা ডলারে রূপান্তর করা বিপিসি এবং ব্যাংকগুলোর জন্য একটি বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। এর ফলে তেলের আমদানি আগের তুলনায় সংকুচিত হয়ে গেছে।

মজুত কমে আসা ও রেশনিং: যখন দেশে ডলারের অভাবে নতুন করে তেল আমদানি কমে যায়, তখন সরকার বাধ্য হয়ে হাতে থাকা তেলের মজুত থেকে খুব হিসাব করে (Rationing) পাম্পগুলোতে তেল সরবরাহ করে। অর্থাৎ একটি পাম্পের যদি প্রতিদিন ৫০০০ লিটার তেলের চাহিদা থাকে, সরকার হয়তো তাকে মাত্র ২০০০ লিটার দিচ্ছে। এই ঘাটতির ফলেই পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয় এবং একসময় তেল শেষ হয়ে যায়।

সহজ কথায়, আপনার পকেটে টাকা (টাকা) থাকলেও যদি দোকানদার সেই টাকা না নেয় (ডলার চায়) এবং আপনার কাছে সেই নির্দিষ্ট টাকা না থাকে, তবে আপনি পণ্য কিনতে পারবেন না। ঠিক এই পরিস্থিতির কারণেই যুদ্ধের পাশাপাশি আমাদের ভেতরের ডলার সংকট পাম্পগুলোকে শূন্য করে দিচ্ছে।

ধাপ ৩: অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট এবং খুচরা বাজারে বেশি দামে তেল বিক্রির কারসাজি

প্রথম দুই ধাপে আমরা জানলাম কেন বিদেশ থেকে তেল আসতে দেরি হচ্ছে এবং ডলারের অভাবে এলসি খুলতে সমস্যা হচ্ছে। এবার আমরা আলোচনা করব আপনার আসল প্রশ্নে—অর্থাৎ কেন পাম্পে তেল নেই, অথচ খুচরা বাজারে ঠিকই বেশি দামে তেল পাওয়া যাচ্ছে? এই ধাপটি বুঝতে হলে আপনাকে বাজারের পেছনের "অদৃশ্য হাত" বা সিন্ডিকেটের খেলাটি বুঝতে হবে।

নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি (Artificial Scarcity): যখনই খবর রটে যে হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধের কারণে তেল আসতে দেরি হবে বা ডলার সংকটে এলসি খোলা যাচ্ছে না, তখনই একদল অসাধু ব্যবসায়ী ও পাম্প মালিক সতর্ক হয়ে যায়। তাদের স্টোরেজে হয়তো ৫০০০ লিটার তেল আগে থেকেই আছে, কিন্তু তারা পাম্পের সামনে ‘তেল নেই’ বোর্ড ঝুলিয়ে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য হলো, সাধারণ মানুষকে বোঝানো যে দেশে তেলের হাহাকার চলছে। যখন মানুষ ভয় পেয়ে যায়, তখনই তারা তেলের দাম বাড়ানোর সুযোগ পায়।

পাম্প থেকে ড্রামে স্থানান্তর: দিনের বেলায় পাম্পে সাধারণ গ্রাহকদের (বাইক বা গাড়ি) তেল দেওয়া বন্ধ রাখলেও, গভীর রাতে বা গোপনে এই পাম্পগুলো থেকেই ড্রামে করে তেল সরিয়ে ফেলা হয়। এই তেলগুলো চলে যায় স্থানীয় ছোট ছোট দোকানদার বা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে। পাম্প মালিকরা জানে যে পাম্পে সরকার নির্ধারিত রেটে তেল বেচতে হবে, কিন্তু খুচরা বিক্রেতার কাছে ড্রাম ভরে বেচলে সেখানে লিটার প্রতি ১০-২০ টাকা বেশি লাভ করা সম্ভব। এই অনৈতিক লাভের আশায় তারা সাধারণ গ্রাহককে ফিরিয়ে দিয়ে কালোবাজারে তেল সরবরাহ করে।

খুচরা বিক্রেতাদের চেইন: আপনি হয়তো দেখেছেন রাস্তার ধারের ছোট দোকানে বোতলে ভরে পেট্রোল বা অকটেন বিক্রি হচ্ছে। এই খুচরা বিক্রেতারা মূলত পাম্পের কর্মচারীদের সাথে যোগসাজশ করে তেল সংগ্রহ করে। যেহেতু পাম্পে তেল নেই, তাই নিরুপায় হয়ে মানুষ এই ছোট দোকানগুলো থেকে চড়া দামে তেল কিনতে বাধ্য হয়। খুচরা বিক্রেতা জানে যে আপনার এখনই তেলের দরকার, তাই সে সুযোগ বুঝে লিটারে ১৫-৩০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম হাঁকায়।

বাজার মনিটরিংয়ের অভাব: সাধারণত জ্বালানি তেলের দাম সরকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু যখন সরবরাহ কম থাকে, তখন স্থানীয় প্রশাসন বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের পক্ষে প্রতিটি গলির ছোট দোকান বা পাম্পের ভেতরের হিসাব চেক করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই তদারকির অভাবকে কাজে লাগিয়ে সিন্ডিকেট চক্রটি সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।

সারকথা: পাম্পে তেল না থাকা মানেই যে দেশে একদম তেল নেই, তা সবসময় ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি পরিকল্পিত সংকট, যাতে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে খুচরা বাজারে বেশি দামে তেল বিক্রি করা যায়। পাম্প মালিক এবং মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা মিলে এই কৃত্রিম অভাব তৈরি করে ফায়দা লুটছে।

ধাপ ৪: পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাধারণ পণ্যের ওপর এর চেইন রিঅ্যাকশন

পাম্পে তেল না পাওয়া এবং খুচরা বাজারে বেশি দামে তেল বিক্রির এই প্রভাব শুধু আপনার বাইক বা গাড়ির ট্যাংকি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ফলে পুরো দেশের অর্থনীতিতে একটি 'চেইন রিঅ্যাকশন' শুরু হয়। যখন তেলের সরবরাহ কমে যায় এবং দাম বেড়ে যায়, তখন তার প্রথম আঘাতটি পড়ে দেশের পরিবহন খাতের ওপর।

নিচে এই ধাপটির বিস্তারিত প্রভাব আলোচনা করা হলো:

পণ্যবাহী ট্রাক ও লরির ভাড়ায় অস্থিরতা: বাংলাদেশ মূলত ট্রাক এবং কাভার্ড ভ্যানের ওপর নির্ভরশীল। ঢাকা বা বড় শহরগুলোতে যে সবজি, চাল বা ডাল আসে, তা আসে দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে। যখন পাম্পে তেল পাওয়া যায় না, তখন ট্রাকচালকদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অথবা কালোবাজার থেকে চড়া দামে তেল কিনতে হয়। এই বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে তারা সরাসরি ট্রাকের ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। ফলে দেখা যায়, আড়ত থেকে পণ্য আসার আগেই তার দাম পরিবহণ খরচের কারণে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

গণপরিবহনের সংকট ও ভোগান্তি: বাসের মালিকরা অনেক সময় দাবি করেন যে নির্ধারিত দামে তেল না পাওয়ায় তারা গাড়ি চালাতে পারছেন না। এতে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমে যায়। এই সুযোগে কিছু অসাধু চালক যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে শুরু করে। একদিকে তেলের আকাল, অন্যদিকে পকেটের বাড়তি টাকা—সাধারণ মানুষ দুই দিক থেকেই চাপে পড়ে।

উৎপাদন খরচ ও মুদ্রাস্ফীতি: শুধু গাড়ি চালানো নয়, অনেক ছোট বড় কলকারখানা এবং সেচ পাম্প ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। যখন কৃষককে বেশি দামে তেল কিনতে হয়, তখন তার ফসল ফলানোর খরচ বেড়ে যায়। এই বাড়তি খরচটা শেষ পর্যন্ত আপনার ডাইনিং টেবিলের খাবারের ওপর এসে পড়ে। অর্থাৎ, তেলের সংকট সরাসরি মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে বাজারে প্রতিটি জিনিসের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।

সরবরাহ চেইনে ভাঙন: পাম্পে তেল না থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবহন মালিকরা ঝুঁকি নিতে চান না। তারা ভয় পান যে মাঝরাস্তায় যদি তেল শেষ হয়ে যায় তবে কী হবে? এই ভয়ের কারণে অনেক সময় সরবরাহ বন্ধ থাকে। আর বাজারে যখন পণ্যের সরবরাহ কমে যায়, তখন অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম আরও বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পায়।

সারসংক্ষেপ: তেলের এই সংকট আসলে একটি বিষচক্রের মতো। আন্তর্জাতিক যুদ্ধ এবং ডলার সংকটের কারণে যে আগুনের সূত্রপাত হয়, তা পরিবহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে আপনার চালের বস্তা আর সবজির ব্যাগের দাম পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এক জায়গায় টান পড়লে তার প্রভাব দেশের একদম প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

ধাপ ৫: বিদ্যুৎ উৎপাদন ও লোডশেডিংয়ের সাথে জ্বালানি তেলের গভীর সম্পর্ক

অনেকেই মনে করেন পাম্পে তেল নেই মানে শুধু গাড়ি চলবেনা, কিন্তু এর প্রভাব আপনার ঘরের ফ্যান বা লাইট পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার একটি বড় অংশ সরাসরি ফার্নেস অয়েল এবং ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। যখন হরমুজ প্রণালীর সংকটে তেল আসতে দেরি হয়, তখন সরকার এক কঠিন দোটানায় পড়ে।

নিচে এই ধাপের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:

বিদ্যুৎ কেন্দ্র বনাম পাম্পের লড়াই: দেশে যখন তেলের মজুত কমে আসে, তখন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় সেই সীমিত তেল দিয়ে গাড়ি চালানো হবে নাকি বিদ্যুৎ কেন্দ্র সচল রাখা হবে। সাধারণত জনরোষ এড়াতে এবং শিল্পকারখানা সচল রাখতে সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। এর ফলে বিপিসি (BPC) থেকে পাম্পগুলোতে তেলের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়। পাম্প মালিকরা যখন চাহিদার তুলনায় অর্ধেক তেল পায়, তখনই তারা "তেল নেই" বলে সাধারণ গ্রাহককে ফিরিয়ে দেয়।

পিক আওয়ারের চাপ: গরমের সময় বা সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা যখন তুঙ্গে থাকে, তখন ডিজেলচালিত 'পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট' গুলো চালাতে হয়। এই প্ল্যান্টগুলো প্রচুর পরিমাণে তেল গিলে ফেলে। পাম্পে যে ডিজেল আপনার ট্রাক বা বাসে যাওয়ার কথা ছিল, তার একটি বড় অংশ তখন চলে যায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। ফলে পাম্পগুলো খালি হতে শুরু করে।

আইপিপি (IPP) বা বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বকেয়া: আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে এবং ডলার সংকট থাকলে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বিদেশ থেকে তেল আমদানির টাকা পায় না। তখন তারা উৎপাদন কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে দেয়। এই ঘাটতি পূরণ করতে সরকারকে সরকারি মজুত থেকে তেল দিতে হয়, যা সরাসরি খুচরা বাজারের সরবরাহ চেইনকে দুর্বল করে দেয়।

লোডশেডিং ও বিকল্প জ্বালানির অভাব: যখন বিদ্যুৎ ঠিকমতো থাকে না, তখন অনেক ছোট কারখানা বা মার্কেট জেনারেটর চালায়। এই জেনারেটরের জন্য প্রচুর ডিজেল বা অকটেনের প্রয়োজন হয়। সাধারণ মানুষ যখন বোতল বা ড্রাম নিয়ে পাম্পে ভিড় করে জেনারেটরের তেলের জন্য, তখন পাম্পে জটলা বাড়ে এবং দ্রুত মজুত শেষ হয়ে যায়।

সারকথা: বিদ্যুৎ খাত হলো তেলের একটি বিশাল 'ভোক্তা'। যখন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়, তখন দেশের সীমিত তেলের বড় একটি অংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চলে যাওয়ার ফলে পাম্পগুলো শুকিয়ে যায়। অর্থাৎ, আপনার এলাকার লোডশেডিং কমানোর মূল্য অনেক সময় পাম্পের তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে দিতে হয়।

ধাপ ৬: সরকারের ভর্তুকি ও বিপিসি (BPC)-র বিশাল লোকসানের হিসাব

পাম্পে তেল না পাওয়া এবং বাজারে দামের এই অস্থিরতার পেছনে সরকারের ভেতরের একটি বড় অর্থনৈতিক সংকট কাজ করে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPC) হলো একমাত্র রাষ্ট্রীয় সংস্থা যারা বিদেশ থেকে তেল কিনে এনে আমাদের দেশে বিক্রি করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক যুদ্ধের কারণে যখন তেলের দাম বাড়ে, তখন বিপিসি এক ভয়াবহ বিপদে পড়ে।

নিচে এই ধাপের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:

ভর্তুকির বোঝা: আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি লিটার প্রতি ১২০ টাকা হয়, আর সরকার যদি সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে দেশে ১০৫ টাকায় বিক্রি করতে চায়, তবে বাকি ১৫ টাকা সরকারকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। একেই বলে 'ভর্তুকি'। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের উত্তেজনায় যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ে, তখন সরকারের এই ভর্তুকির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। এক সময় সরকারের পক্ষে এই বিশাল লোকসান টানা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিপিসি-র পেমেন্ট সংকট: বিপিসি যখন বিদেশ থেকে তেল কেনে, তখন তাদের ডলারে পেমেন্ট করতে হয় (যেটা আমরা ২ নম্বর ধাপে আলোচনা করেছি)। কিন্তু সরকার যখন ভর্তুকি দিতে হিমশিম খায়, তখন বিপিসি-র হাতে নতুন তেল কেনার মতো পর্যাপ্ত টাকা থাকে না। তারা তখন পুরোনো দেনা মেটাতেই ব্যস্ত থাকে। এই দেনা পরিশোধ না করলে বিদেশি কোম্পানিগুলো নতুন তেলের জাহাজ পাঠাতে চায় না। ফলে পাম্পে সরবরাহের যে চেইন, তা মাঝপথেই আটকে যায়।

দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা ও সরবরাহ বন্ধ: যখন সরকার বুঝতে পারে যে ভর্তুকি আর দেওয়া সম্ভব নয় এবং তেলের দাম বাড়ানো দরকার, তখন একটি অঘোষিত অস্থিরতা তৈরি হয়। পাম্প মালিকরা আগে থেকেই খবর পেয়ে যান যে দাম বাড়তে পারে। তখন তারা সরকারের কাছ থেকে কম দামে কেনা তেল মজুত করে রাখেন যাতে দাম বাড়ার পর তারা লিটার প্রতি ১০-২০ টাকা বাড়তি লাভ করতে পারেন। এই ‘হোর্ডিন বা মজুতদারি’র কারণেই আপনি পাম্পে গিয়ে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড দেখেন।

আর্থিক সক্ষমতার অভাব: যুদ্ধের কারণে জাহাজের ভাড়া এবং বিমা খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিপিসি-র বাজেটে টান পড়ে। তারা যদি মাসে ১০টি জাহাজ আমদানির পরিকল্পনা করে, টাকার অভাবে হয়তো ৭টি জাহাজ আনে। এই যে ৩টি জাহাজের ঘাটতি, এটিই দেশের পাম্পগুলোতে হাহাকার তৈরি করে। অর্থাৎ, তেলের আকাল মূলত আমাদের দেশের আর্থিক টানাপোড়েনের একটি বহিঃপ্রকাশ।

সারসংক্ষেপ: সরকার যখন লোকসান কমাতে গিয়ে তেল আমদানিতে লাগাম টানে বা দাম বাড়ানোর চিন্তা করে, তখনই বাজারে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। বিপিসি-র খালি পকেট আর সরকারের ভর্তুকির অভাবই পাম্পের তেলের লাইনকে দীর্ঘ করে তোলে।

ধাপ ৭: তেল চুরির সিন্ডিকেট, অবৈধ মজুতদারি এবং ‘সিস্টেম লস’-এর কারসাজি

আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আর ডলার সংকটের বাইরেও আমাদের দেশের ভেতরে এমন কিছু "অদৃশ্য চোর" আছে, যারা পাম্পে তেলের কৃত্রিম আকাল তৈরি করতে ওস্তাদ। এই ধাপটি বুঝতে হলে আপনাকে তেলের ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত আসার ভেতরের নোংরা রাজনীতিটা বুঝতে হবে।

নিচে এই ধাপের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:

ডিপো থেকে পাম্পে আসার পথে ‘তেল গায়েব’: বিপিসি (BPC) যখন চট্টগ্রামের প্রধান ডিপো থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আঞ্চলিক ডিপোতে তেল পাঠায়, তখন মাঝপথেই একটি বিশাল সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়। লরি বা জাহাজে করে তেল পরিবহনের সময় কৌশলে তেল সরিয়ে ফেলা হয় এবং সেখানে ভেজাল মেশানো হয়। এই চুরির ফলে যে পরিমাণ তেল পাম্পে পৌঁছানোর কথা ছিল, তার চেয়ে কম পৌঁছায়। এই ঘাটতি পূরণের জন্য পাম্প মালিকরা সাধারণ মানুষের কাছে তেল বিক্রি কমিয়ে দেন।

বিপিসি-র অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ: অনেক সময় ডিপোর কিছু অসাধু কর্মকর্তা পাম্প মালিকদের সাথে গোপন চুক্তি করেন। যখন যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহ কম থাকে, তখন তারা সাধারণ পাম্পে তেল না পাঠিয়ে কালোবাজারি বা বড় বড় শিল্প কারখানার কাছে সরাসরি বেশি দামে তেল বিক্রি করে দেয়। এর ফলে আপনার এলাকার পাম্পটি তেল পায় না এবং আপনাকে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড দেখতে হয়।

তেলের ড্রাম ও অবৈধ গোডাউন: আপনি হয়তো লক্ষ্য করেছেন, পাম্পে তেল নেই বললেও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির গ্যারেজ বা গুদামে শত শত ড্রাম ভর্তি তেল লুকানো থাকে। পাম্প মালিকরা জানে যে পাম্পে মিটার দিয়ে তেল বিক্রি করলে রেকর্ড থাকে এবং সরকার নির্ধারিত দামেই বেচতে হয়। তাই তারা রাতের আঁধারে ড্রাম ভরে তেল সরিয়ে ফেলে স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কাছে। এই সিন্ডিকেটই পরে খুচরা বাজারে চড়া দামে সেই তেল ছেড়ে দেয়।

সিস্টেম লস-এর অজুহাত: তেল বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে যাওয়া বা লোড-আনলোডের সময় কিছুটা কমে যাওয়াকে বলা হয় ‘সিস্টেম লস’। কিন্তু অসাধু চক্র এই লসকে কয়েক গুণ বেশি দেখিয়ে বিশাল পরিমাণ তেল চুরি করে। যখন এই চুরির পরিমাণ বেড়ে যায়, তখন সরকারি হিসাবে তেলের মজুত কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে পাম্পে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তেল থাকে না।

সারসংক্ষেপ: যুদ্ধ বা ডলার সংকট যদি আগুনের মতো হয়, তবে এই অভ্যন্তরীণ চুরির সিন্ডিকেট হলো সেই আগুনে ঘি ঢালা। পাম্পে তেল না পৌঁছানোর পেছনে এই অদৃশ্য পাচারকারী ও চোরদের বড় ভূমিকা থাকে, যারা সাধারণ মানুষের সংকটকে নিজেদের পকেট ভরার উৎস হিসেবে দেখে।

ধাপ ৮: মানুষের আতঙ্কিত ক্রয় (Panic Buying) এবং কৃত্রিম সংকটের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

প্রথম সাতটি ধাপে আমরা সিস্টেমের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু ৮ নম্বর ধাপে আমরা আলোচনা করব আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আচরণের কারণে কীভাবে সংকট আরও ঘনীভূত হয়। যখনই ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বা তেলের জাহাজ আটকে যাওয়ার খবর টিভিতে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ায়, তখনই বাজারে এক ধরনের ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত কেনাকাটা শুরু হয়।

নিচে এই ধাপের বিস্তারিত মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তব প্রভাব তুলে ধরা হলো:

প্রয়োজনের অতিরিক্ত মজুত করার প্রবণতা: ধরুন, একজন মোটরসাইকেল চালকের প্রতিদিন ২ লিটার তেল লাগে। কিন্তু যখনই তিনি শোনেন যে "তেল পাওয়া যাচ্ছে না", তখন তিনি পাম্পে গিয়ে একবারে ১০ লিটার বা ফুল ট্যাঙ্ক করার চেষ্টা করেন। এমনকি অনেকে বাসা থেকে পানির বোতল বা ড্রাম নিয়ে পাম্পে লাইন ধরেন। এই যে হঠাৎ করে তেলের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া, এর জন্য পাম্পগুলো মোটেও প্রস্তুত থাকে না। ফলে পাম্পের স্বাভাবিক মজুত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।

গুজবের দ্রুত বিস্তার: যুদ্ধের খবরের সাথে সাথে একদল মানুষ রটিয়ে দেয় যে "আগামীকাল থেকে তেল আর পাওয়াই যাবে না" অথবা "তেলের দাম এক ধাক্কায় ২০ টাকা বাড়বে"। এই গুজবে কান দিয়ে হাজার হাজার মানুষ একসাথে পাম্পে ভিড় করে। যখন পাম্পে অস্বাভাবিক ভিড় হয়, তখন পাম্প মালিকরা ভয় পেয়ে যান বা সুযোগ বুঝে তেল বিক্রি বন্ধ করে দেন। এই শৃঙ্খলাহীন পরিস্থিতিই মূলত ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলানোর পথ তৈরি করে দেয়।

অসাধু চক্রের সুযোগ গ্রহণ: যখন পাম্পের সামনে শত শত মানুষের দীর্ঘ লাইন থাকে, তখন পাম্প মালিকরা বুঝতে পারেন যে মানুষের এখন তেলের খুব জরুরি প্রয়োজন। তারা তখন পাম্পের মেশিন বন্ধ রেখে পেছনের দরজা দিয়ে পরিচিত লোকেদের কাছে বা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে চড়া দামে তেল সরিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ, আপনার আতঙ্কই অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য লাভের বড় সুযোগ তৈরি করে দেয়।

সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যহীনতা: বিপিসি (BPC) প্রতিদিনের একটি নির্দিষ্ট হিসাব অনুযায়ী পাম্পে তেল পাঠায়। কিন্তু প্যানিক বায়িংয়ের কারণে যদি একদিনে তিন দিনের তেল বিক্রি হয়ে যায়, তবে পরের দুই দিন পাম্পটি পুরোপুরি শূন্য বা ‘ড্রাই’ থাকে। নতুন জাহাজ বা লরি আসার আগে এই যে শূন্যতা তৈরি হয়, এটিই সাধারণ মানুষের মনে আরও বেশি আতঙ্ক তৈরি করে।

সারসংক্ষেপ: যুদ্ধ বা ডলার সংকট যদি মূল সমস্যা হয়, তবে মানুষের এই আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনা সেই সমস্যাকে ১০ গুণ বাড়িয়ে দেয়। সবাই যদি যার যার প্রয়োজনটুকু কিনতেন, তবে পাম্পে এই চরম হাহাকার হয়তো এতটা প্রকট হতো না। মানুষের ভয়ের সুযোগ নিয়ে একদল লোক কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

ধাপ ৯: বিকল্প জ্বালানির অভাব এবং আমদানির ওপর একক নির্ভরশীলতার ঝুঁকি

৯ম ধাপে আমরা আলোচনা করব কেন আমাদের দেশ তেলের সংকটে পড়লে পুরো থমকে যায়। এর মূল কারণ হলো আমাদের একক নির্ভরশীলতা। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল আসা বন্ধ হলে আমরা কেন এত অসহায় হয়ে পড়ি, তার গভীরে রয়েছে আমাদের জ্বালানি কাঠামোর কিছু দুর্বলতা।

নিচে এই ধাপের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:

তেলের কোনো শক্তিশালী বিকল্প নেই: আমাদের দেশের পরিবহন খাত (বাস, ট্রাক, লরি) প্রায় শতভাগ ডিজেল এবং পেট্রোল-অকটেনের ওপর নির্ভরশীল। উন্নত বিশ্বে এখন ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) বা ট্রেনের ব্যাপক প্রচলন থাকলেও, আমাদের দেশে মালপত্র পরিবহনের জন্য ট্রাক ছাড়া আর কোনো বড় বিকল্প নেই। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সামান্য টান পড়লেই আমাদের পুরো সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ে। পাম্পে তেল না থাকা মানেই দেশের চাকা থমকে যাওয়া।

নিজস্ব খনিজ তেলের অভাব: বাংলাদেশ গ্যাসের দিক থেকে কিছুটা সমৃদ্ধ হলেও, আমাদের নিজস্ব কোনো খনিজ তেলের খনি নেই (সিলেটে সামান্য যা পাওয়া যায় তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য)। ফলে আমাদের প্রতিটি ফোঁটা তেলের জন্য বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যে যখনই যুদ্ধের দামামা বাজে, আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। আমাদের নিজস্ব কোনো ‘ব্যাকআপ’ বা বিকল্প উৎস নেই যা দিয়ে আমরা সংকটকাল পার করতে পারি।

মজুত ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা: একটি দেশের আদর্শ নিয়ম হলো অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত রাখা। কিন্তু বাংলাদেশের মজুত ক্ষমতা (Storage Capacity) তুলনামূলকভাবে অনেক কম—সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ দিনের। যখন হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পথে জাহাজ আটকে যায় এবং নতুন তেল আসতে ১৫-২০ দিন দেরি হয়, তখন আমাদের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসে। মজুত শেষ হওয়ার আগেই সরকার পাম্পগুলোতে সরবরাহ কমিয়ে দেয় যাতে একদম শূন্য না হয়ে যায়। এই ‘রেশনিং’-এর কারণেই আপনি পাম্পে গিয়ে তেল পান না।

রিফাইনারি বা শোধনাগারের সীমাবদ্ধতা: আমাদের দেশে মাত্র একটি বড় তেলের শোধনাগার (ইস্টার্ন রিফাইনারি) আছে। বিদেশ থেকে যখন অপরিশোধিত তেল (Crude Oil) আসে, তা পরিষ্কার করে ব্যবহার উপযোগী করতে সময় লাগে। যদি কোনো কারণে অপরিশোধিত তেলের জাহাজ আসতে দেরি হয়, তবে আমাদের শোধনাগার বসে থাকে। এর ফলে বাজারে পরিশোধিত তেলের (পেট্রোল, অকটেন) তীব্র সংকট তৈরি হয়।

সারসংক্ষেপ: আমরা আসলে তেলের জন্য পুরোপুরি বিদেশের ওপর জিম্মি। আমাদের নিজস্ব বিকল্প কোনো জ্বালানি উৎস বা বড় মজুত ব্যবস্থা না থাকায়, মধ্যপ্রাচ্যের এক কোণায় যুদ্ধ লাগলে তার ধাক্কায় আমাদের দেশের পাম্পগুলো দ্রুত শুকিয়ে যায়। এই পরনির্ভরশীলতাই আমাদের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

এই ধাপটি কি বুঝতে পেরেছেন? কেন আমরা চাইলেই হুট করে তেলের বিকল্প কিছু ব্যবহার করতে পারছি না?

ধাপ ১০: উত্তরণের পথ এবং ব্যক্তিগত সচেতনতা 

আমরা আলোচনার একদম শেষ ধাপে চলে এসেছি। আগের ৯টি ধাপে আমরা জেনেছি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালীর সংকট, ডলারের টানাপোড়েন এবং দেশের ভেতরের সিন্ডিকেট কীভাবে পাম্পগুলোকে তেলশূন্য করে দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচার উপায় কী এবং আপনি একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে কী করতে পারেন?

নিচে এই শেষ ধাপের বিস্তারিত এবং কার্যকর কিছু পয়েন্ট তুলে ধরা হলো:

জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ: বাংলাদেশ সরকার এখন চেষ্টা করছে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না থেকে অন্য দেশ (যেমন: ভারত বা রাশিয়া) থেকে পাইপলাইনে বা বিকল্প পথে তেল আমদানির ব্যবস্থা করতে। এটি সফল হলে হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধ লাগলেও আমাদের দেশে তেলের প্রবাহ একদম বন্ধ হবে না। ভারতের 'নুয়ালীগড়' থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আসা ডিজেল আমাদের উত্তরের জেলাগুলোতে বড় জোগান দিচ্ছে।

মজুত ক্ষমতা বৃদ্ধি: বর্তমানে সরকারের বড় একটি প্রজেক্ট চলছে যার মাধ্যমে সাগরের নিচে পাইপলাইন (Single Point Mooring) বসিয়ে দ্রুত তেল খালাস করা এবং বিশাল বড় বড় স্টোরেজ ট্যাংক তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের তেলের মজুত যদি ৬০ থেকে ৯০ দিনের করা যায়, তবে সাময়িক যুদ্ধ বা জাহাজ আসতে ১০-১৫ দিন দেরি হলেও পাম্পে হাহাকার তৈরি হবে না।

কঠোর বাজার মনিটরিং ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং: পাম্প থেকে তেল কেন ড্রামে যাচ্ছে বা কেন খুচরা বাজারে বেশি দামে পাওয়া যাচ্ছে, তা বন্ধ করতে 'ডিজিটাল মনিটরিং' জরুরি। পাম্পের মিটারের সাথে যদি কেন্দ্রীয় সার্ভারের সংযোগ থাকে, তবে কতটুকু তেল পাম্পে আসলো আর কতটুকু বিক্রি হলো তার হিসাব সরকার মুহূর্তেই পেয়ে যাবে। এতে কৃত্রিম সংকট বা অসাধু মজুতদারি বন্ধ হবে।

ব্যক্তিগত মিতব্যয়িতা ও 'প্যানিক বায়িং' বন্ধ করা: আমাদের সবচেয়ে বড় ভূমিকা হলো গুজব এড়িয়ে চলা। যখনই পাম্পে তেল নেই শুনবেন, তখনই ড্রাম বা বোতল নিয়ে ভিড় করবেন না। আপনার আতঙ্কের সুযোগ নিয়েই সিন্ডিকেট দাম বাড়ায়। যদি সবাই মিলে অতিরিক্ত তেল কেনা বন্ধ করি, তবে পাম্পের সীমিত মজুত দিয়েও অনেকদিন চালানো সম্ভব। এছাড়া সম্ভব হলে কাছাকাছি গন্তব্যে বাইক বা গাড়ির বদলে সাইকেল বা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করা এই সংকটের সময়ে একটি বড় সমাধান হতে পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর: দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে আমাদের সোলার পাওয়ার এবং ইলেকট্রিক যানবাহনের দিকে ঝুঁকতে হবে। আমরা যদি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা ৫-১০ শতাংশও কমাতে পারি, তবে আন্তর্জাতিক যুদ্ধের ধাক্কা আমাদের অর্থনীতিতে এতটা প্রবল হবে না।

সারসংক্ষেপ: ভাই, তেলের এই সংকট মূলত একটি 'গ্লোবাল চেইন রিঅ্যাকশন'। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালীর মুখ বন্ধ হওয়া থেকে শুরু করে আমাদের দেশের ভেতরের পকেটে ডলারের টান এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের লোভ—এই সবকিছুর যোগফলই হলো পাম্পের ওই 'তেল নেই' সাইনবোর্ড। সরকার যদি আমদানির উৎস বাড়াতে পারে এবং আমরা যদি আতঙ্কিত না হয়ে মিতব্যয়ী হই, তবেই এই চরম ভোগান্তি কমানো সম্ভব।